বট গাছে উঠে গা ছুয়ে দেওয়া খেলার ঘটনা

in আমার বাংলা ব্লগlast year
আসসালামু আলাইকুম



হাই বন্ধুরা!

আমার গল্পের রাজ্যে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগতম। পূর্বসপ্তার ন্যায় আজকে উপস্থিত হয়ে গেলাম সুন্দর একটি গল্প নিয়ে। যে গল্পের মাধ্যমে আপনারা জানতে পারবেন আমার জীবনে কোন একটা লুকিয়ে থাকা ঘটনা। একজনের জানা ঘটনা অন্য জনের মাঝে ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় অজানা তথ্য। ঠিক তেমনি সুন্দর একটি গল্প নিয়ে উপস্থিত হয়েছি আজ। আশা করি স্মৃতিচারণ মূলক এই গল্প আপনাদের অনেক অনেক ভালো লাগবে। তাই চলুন আর দেরি না করে গল্পটা পড়ি এবং গল্প পড়ার আনন্দ উপভোগ করি।


বট বৃক্ষের গল্প:

IMG_20231212_171120_982.jpg


আমাদের গ্রামের নাম জুগীরগোফা। আমাদের গ্রামটি গাংনী থানা মেহেরপুর জেলার অন্তর্গত। আমাদের গ্রামের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় পাশাপাশি। পাশে আরো রয়েছে ভূমি অফিস, কৃষি অফিস, কাউন্সিল ভবন এবং গ্রামের ছোট্ট বাজার। যাই হোক সেখানে তিন রাস্তার মোড়ে রয়েছে সুন্দর এই বটগাছটা। প্রাইমারি জীবন থেকে এই বটগাছটা আমার খুবই প্রিয় এবং সুপরিচিত। ছোটবেলায় যেমন মোটা দেখে এসেছিলাম ঠিক তেমনটাই রয়ে গেছে মনে হয়,বৃদ্ধি খুব কম পেয়েছে। শুধু গাছ থেকে কয়েকটা শিকড় বের হয়ে মাটি ছুঁয়ে গেছে। তবে আমাদের সেই সময় গাছ কোন শিকড় ফেলে ছিল না। গাছটা কত দিনের পুরাতন কেউ বলতে পারে না। এখনকার সময় গাছে উঠে কেউ বসে থাকে না। মাঝেমধ্যে কয়েকজন মানুষ ছাগলের পাতার জন্য গাছে উঠলে উঠে, নাই না। কিন্তু আমরা যখন প্রাইমারি হাইস্কুলে পড়তাম তখন এই গাছটাই স্কুলের ছাত্র এমনকি ছাত্রীরা উঠত। এখন চলে এসেছে মোবাইল অনলাইন এর যুগ, তাই গাছ পানে কেউ ঘুরে তাকায় না কিন্তু আমাদের সময় তো সেটা ছিল না। স্কুলে এসে বিভিন্ন প্রকার খেলাধুলা চলতো বন্ধু বান্ধবীদের। তবে এই বটগাছটা ছিল খেলার এক প্রাণকেন্দ্র। ঠিক তেমনি অজস্র ঘটনার মাঝে সুন্দর একটি ঘটনা আপনাদের কাছে তুলে ধরব।

প্রাইমারি পড়াকালীন একটি ঘটনা। আমরা যখন স্কুলে আধা ঘন্টা এক ঘন্টা আগে উপস্থিত হয়ে যেতাম,তখন আমরা এই বটগাছে খেলতে উঠতাম। আবার যখন টিফিন দিত স্কুলের অধিকাংশ ছাত্ররাই দৌড়ে চলে আসতাম এই বট গাছের নিকট। কেউ বটগাছের নিচে খেলতো, কেউ বট গাছে উঠে খেলত। এখন আপনাদের প্রশ্ন থাকতে পারে বট গাছে উঠে কি খেলা খেলতাম? আপনারা বট গাছের লক্ষ্য করে দেখুন একটি ডালের সাথে আরেকটি ডালের সংযোগ রয়েছে। আমাদের এখানে যারা চালাক চতুর আর সাহসী ছেলেরা ছিল, তারা গাছে উঠে ধরা ধরি খেলত। গাছের মেন অংশে অনেকে বসে থাকতাম। আর দুইটা দলে দুই তিন জন করে বিভক্ত হয়ে যে যার মত গাছের দূরে দূরে অবস্থান করতো। তবে বলা থাকত গাছ এর ডাল কেউ ঝেকি মারতে পারবে না। শুধু খেলাটা হবে এমন নির্দিষ্ট একজন আরেকজনাকে ধরবে কেউ কাউকে ধরে দিবে না। এমন আজব খেলা কোথা থেকে শিখেছিলাম কেউ জানিনা, তবে এই খেলাটাই হত সেই সময় এই গাছকে কেন্দ্র করে। আমাদের আগের প্রজন্ম নাকি এভাবে এই গাছে খেলেছে। যাই হোক একজন থাকতো এক প্রান্তে আরেকজন থাকতো আরেক প্রান্তে আর এভাবেই ধরাধরি খেলা শুরু হয়ে যেত, কে কত দ্রুত ডাল বেয়ে এসে তাকে ছুঁয়ে দিতে পারে। আর যারা বেশি সাহসী ছিল তারাই এই খেলা অংশ নিতো। যাকে ধরতে হবে সে যেই ডাল দিয়ে অতিক্রম করবে সেই ডাল দিয়েই যেয়ে তাকে ছুঁতে হবে, বিষয়টা এমন ছিল। শুরুতে দুইজন দুই প্রান্তে। আমার ফুফাতো ভাই স্বপন আরেক জন হুমায়ুন নামের একটি ছেলে তারা ক্লাস ফাইভে পড়তো,আমারা ক্লাস ফরে পড়তাম। এরা দুইজন ধরাধরি কনটেস্ট চালাচ্ছে। স্বপন ভাই খুবই পাতলা ছিল সে দ্রুত একডাল থেকে আরেক ডালে এভাবে ছুটে চলছে কিন্তু হুমায়ুন পেরে উঠছে না। খেলাটা বেশ সুন্দর জমে গেছিল। আমরা যারা গাছের গায়ের ডালে বসার মত সুন্দর জায়গায় জায়গায় বসে থাকতাম, তারা হাততালি দিতাম আর শিষ দিতাম। লক্ষ্য করলাম স্বপন ভাই দুই পাক অতিক্রম করে ফেলল এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে তার পিছু পিছু হুমায়ুন শুধুমাত্র গা ছুঁয়ে দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল ছুঁতে পারল না। দ্রুত সে এক ডাল থেকে আর এক ডালে চলে যাতে থাকলো,গাছের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে। এদিকে আমাদের ক্লাসের টাইম হয়ে যাচ্ছে, টিফিন টাইম ফুরিয়ে আসছে। কে জানি ঘড়ি দেখে বলল। সেই সময় তো সবার ঘড়ি থাকত না। কয়েকজনের হাতে থাকতো কিনা এমন। এই মুহূর্তে স্বপন ভাই উপর থেকে নিচের দিকে নেমে আসছে। এমন মুহূর্তে মোটা একটি মরা ডালের সাথে স্বপন ভাইয়ের বুকের জমা আটকে গেল। স্বপন ভাই মোটা গাছের ডাল দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখল। এই মুহূর্তে সবাই ভয় পেয়ে গেল গাছের ডালটা ছিল বাঁকা সেখান থেকে ছুড়ানো ছিল বেশ মুশকিল।

IMG_20231212_171121_806.jpg

লক্ষ্য করে দেখলাম স্বপন ভাই ভয়ে কান্না করা শুরু করে দিয়েছে। যে হুমায়ুন তাকে পিছু পিছু ধরতে যাচ্ছিল সেও ভয় পেয়ে গেল, সে থেমে গেল। বলল আমি ধরছি না, ভয় পাস না। আমি থেমে গেছি। তুই কিভাবে সরে আসতে পারবি সরে আয়। কিছুতেই স্বপন ভাই তার আটকে পড়া ডালের মধ্য থেকে বের হতে পারল না। এদিকে 'বুইদু'; 'সাদ্দাম' নামের বন্ধু ছিল তাদের। তারা দ্রুত বাঁকা সেই ডালে উঠে চলে গেল। এদিকে আমার হাত-পা বেশ শীতল হয়ে আসতে থাকল আর কাপছিলাম। এরপর একজন স্বপন ভাইকে গাছের সাথে চেপে ধরে থাকলো। আর একজন উপরের ডাল থেকে স্বপন ভাইয়ের জামার বোতাম গুলো খুলতে থাকলো। যখন জামার বোতাম গুলো টেনে টেনে খোলা হল এরপর স্বপন ভাই মুক্তি পেল। পাশাপাশি লক্ষ্য করলাম জামাটাও বেশ ছেড়ে গেল। কারণ গাছের মধ্যে মরা একটি ডাল তার বুক ও জামার মাঝখানে কিভাবে চলে গেছিল সে বুঝতে পারিনি। যেহেতু ধরাধরি খেলা চলছে, গাছের মধ্যে। তাই সে দ্রুত চলতে গিয়ে এমনটা হয়ে গেছিল। আর বিষয়টা ছিল উল্টা পাশে, উপর থেকে নিচে নামা তাই এমন দুর্ঘটনার শিকার। যাই হোক এরপর মুক্তি পেয়ে ধীর ধীরে গাছ থেকে নেমে আসলো। নামার পর দেখা গেল তার হাত পা এতটাই জোরে কাঁপছে যেন থামাতে পারছে না। এরপর কিছুক্ষণ মাটিতে বসে থাকলো। আমাদের সকলের ক্লাসে যেতে একটু দেরি হল। আমাদের 'জালাল স্যার' মাইর শাসিয়ে বলতে থাকলো এত দেরি করে তোরা সবাই আসলি কোথায় ছিলি। তখন স্যারের কাছে সবাই ঘটনা শেয়ার করলো। স্যার বলে দিল এভাবে যেন আর কোনদিন শুনিনি কেউ ওই খেলা খেলতে গেছে। এটাই ছিল আমার অতীতের সেই সোনালী দিনের এক ভয়ানক স্মৃতি।


গল্পটি পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

received_434859771523295.gif


পুনরায় ফিরে আসবো নতুন কোন গল্প নিয়ে। ততক্ষণ ভালো থাকুন সবাই, সবার জন্য শুভকামনা রইল। আল্লাহ হাফেজ।

TZjG7hXReeVoAvXt2X6pMxYAb3q65xMju8wryWxKrsghkLbdtHEKTgRBCYd7pi9pJd6nDf4ZPaJpEx3WAqvFVny2ozAtrhFXaDMnAMUAqtLhNESRQveVFZ7XHcED6WEQD48QkCkVTAvNg6.png

Sort:  
 last year 

গাছে উঠতেই পারি না আর আপনারা গাছের উপরে কি ভয়ঙ্কর খেলাই না খেলেছিলেন। তাও তো ভালো ছোট দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। তা না হলে বড় কোন দুর্ঘটনা হতে পারতো। তাছাড়া উনি যেভাবে গাছের ডালে আটকা পড়েছিল তাতে তো ভয় পাওয়ারই কথা। কিন্তু অন্য বন্ধুরা বুদ্ধি করে জামার বোতাম খুলে ওনাকে উদ্ধার করেছিলো জন্য সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন।

 last year 

এ থেকেতো আমি অনেক গাছে ওঠা শিখেছিলাম আপু‌। তালগাছ নারিকেল গাছ সব গাছে আমি উঠতে পারি।

 last year 

হি হি হি। আমি তো বাবা জীবনেও এমন খেলার নাম শুনি নাই। তবে আমার কাছে তো ভয়ই লাগছে। কেউ পড়ে যেয়ে যদি হাত পা ভেঙ্গে যেত। এমন আজব খেলার নাম আমি কখনও শুনি নাই। গাছে উঠার আগেই তো মরে যাবো রে। ভয়ংকর পোস্ট ছিল আমার জন্য।

 last year 

হাই স্কুলে ওঠার পরও ক্লাস এইট পর্যন্ত এ খেলা করেছি এই বটগাছে

 last year 

এই খেলাটি আগে কখনো শুনিনি তবে সে রিক্সি একটি খেলা ছিল দেখছি। বান্দরের মত এর এক ডাল থেকে অন্য ডালে যাওয়া বেশ মজারও বটে তবে অনেক সাহসের প্রয়োজন। ভাগ্যিস সেদিন আপনার ভাইয়ের কিছু হয়নি। সুন্দর একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন আমাদের মাঝে

Posted using SteemPro Mobile

 last year 

হ্যাঁ সেদিনকি কপালগুনে বেচে গেছে কিন্তু তার পরেও খেলেছে প্রতিনিয়ত।

 last year (edited)

এই বট গাছে কতই না স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এক সময় এ বটগাছা খুব চড়েছি মাধ্যমিক পড়া অবস্থায় বন্ধুদের সাথে এই বট গাছের ডালে কত ঘুরে বেড়িয়েছে। আপনার গল্পটি পড়ে আবার সেইথের কথা মনে পড়ে গেল ভাই। ধন্যবাদ সুন্দর একটি বিষয় নিয়ে পোস্ট করার জন্য।

 last year 

হ্যাঁ এই গাছের স্মৃতি সেদিন স্মরণ করেছিলাম। এগুলা অন্যদের কাছে আশ্চর্য মনে হচ্ছে কিন্তু আমরা যে এই গাছে খেলা করেছি সেটা যে সত্য কথা