বই রিভিউ। হত্যাবৃত্ত-অনুপম মুখোপাধ্যায়।
প্রিয় আমার বাংলা ব্লগের বন্ধুরা,
সমস্ত ভারতবাসী এবং বাংলাদেশের বাঙালি সহযাত্রীদের আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।


আশা করি আপনারা ঈশ্বরের কৃপায় সুস্থ আছেন, সব দিক থেকে ভালোও আছেন। আপনাদের সবার ভালো থাকা কামনা করে শুরু করছি আজকের ব্লগ।
আমাদের বাড়িতে রাজনীতি কোন অচ্ছুৎ বিষয় ছিল না আর বাবা মা সকলেই আলাদা আলাদা মতাদর্শে বিশ্বাসী। ফলে একটা উন্মুক্ত আলোচনার পরিবেশে বড় হয়েছি বলা চলে৷ তবে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটা মানুষই তাদের রাজনৈতিক মতামত বা সরকারের সমালোচনা প্রকাশ্যেই করতে পারে। এই কারণে জন্মগত ভাবে বাঙালি হিসেবে আমাদের মধ্যে খোলা জানালা নিজের অজান্তেই তৈরি হয়েছে। এই খোলা জানালার কারণেই যখন আস্তে আস্তে বড় হয়েছি জীবনের সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত অধ্যায়, যেমন ধর্ম, প্রেম, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়গুলি সম্পর্কেই খুব একটা গোঁড়ামি জন্মায়নি। আসলে কথায় বলে না, একটা খোলা জানালা থাকলেই দক্ষিণা বাতাস ঠিক সময় সুযোগ করে ঢুকতেই থাকবে৷
সোসাল মিডিয়ায় যখন 'হত্যাবৃত্ত' উপন্যাসটির রিভিউ পড়লাম এবং লেখকের কিছু কথা পড়লাম তখনই ঠিক করে ফেলেছিলাম বইটা আমি পড়বই। অনলাইনই আনিয়েছিলাম। সাহায্য করেছিলেন স্বয়ং লেখক। না না বিশেষ কোন পরিচিতির সুবাদে না, নিছক পাঠককে সহায়তার হাত বাড়িয়েছিলেন একটা ফোন নম্বর দিয়ে৷
গত দুইদিন ধরে মারাত্মক গলা ব্যথায় কাবু। কিছুতেই বসতে পারছিলাম না স্থির হয়। কিন্তু গতকাল সন্ধে থেকে ঠিক করলাম, যত কষ্টই হোক বইটা আমি পড়বোই। কারণ মুখের সামনে খাবার পেটে খিদে অথচ খাব না এমন তো হয় না।
উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু হল বর্তমান দিনকালের রাজনীতি এবং গদির লড়াই সাথে দৈনন্দিন জীবনের নানান দুর্বলতা যা বাস্তব জীবনে ব্যবহৃত হয় অস্ত্র হিসেবে। এই যেমন ধর্ম, যৌনতা, প্রেম, আকর্ষণ, ইত্যাদি নানান মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারার খোসা ছাড়ানো অবয়ন। খোসা ছাড়ানো কেন বলছি? উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্রেই নানান দিক আছে। তাদের ভেতর ঈশ্বর ও শয়তান পাশাপাশি রয়েছে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই তা বর্তমান। মানুষ পারে না এমন কোন কাজ হয় নেই। অর্থাৎ মানুষ সব পারে। মানুষই সব পারে। কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা বা অন্য কোন কারণে অনেকক্ষেত্রে পা প্রকাশ না পেলেও ভেতরে সবই ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো চাপা থাকে।
উপন্যাসের নায়ক হলেন, রাজকুমার চৌধুরী, পার্শ্ব চরিত্র হল, বিবেকানন্দ বসাক, সোনিয়া বসাক, আলেফ আলি, সুদীপা আরও অনেকে। গল্পটি মূলত একবার আলেফের চোখ দিয়ে, একবার সোনিয়ার চোখ দিয়ে আর একবার রাজকুমারের চোখ দিয়ে এগিয়েছে। ফলে তিনজনের নানান মনস্তাত্ত্বিক দিক পাঠকের কাছে ধরা পড়েছে। ভোট এবং শহরের চেয়ারের রাজা বিবেকানন্দ বসাক নিজের গদি রাখার চেষ্টা করছে, আলেফ তার ইশারার পুতুল আবার সাধারণ মানুষের ত্রাসও বটে। এদিকে আদুরে কন্যা সোনিয়া বাবার ছত্রছায়ায় একেবারে নিজের মতো বেড়ে ওঠা একটি টবের গাছ। আর রাজকুমার হলেন স্কুল শেষ না করা অথচ মুক্তচিন্তা ও নানান জ্ঞানের ভান্ডার, বিবেকানন্দ বসাকের বন্ধুর ছেলে। এদেরই চিন্তাভাবনা জীবনযাপন ও আদর্শ ইত্যাদি নিয়ে স্টোরি লাইন তৈরি।
উপন্যাসের সব থেকে মজার বিষয় হল মুক্ত মন। কেউ যদি কোন রকম দিক দিয়ে বদ্ধ হন এই বই হয় তাকে ভাঙবে নয় সে এই বইয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকবেন। আমি তো বলব এ কেবল মাত্র সময়ের দলিল। ঠিক যেমনটা মহাভারতকে মনে হয় সময়ের দলিল তেমনিই। এখানেও গল্প আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করেছে, সাথে ছড়িয়ে দিয়েছে ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের উন্মুক্ত আলোচনা সাথে মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে ঘটে যাওয়া চাকরি বিভ্রাট থেকে ধর্ষণ সব কিছুই গুছিয়ে এক ছাতার তলায় এনেছেন লেখক।
সব থেকে ভালো লেগেছে রাজকুমার চৌধুরীর কথাগুলো। প্রতিটি পাঠককেই আরও একবার ভাবতে এবং সমাজদর্শন জীবন দর্শন নিয়ে আরও একবার পড়াশুনো করতে উস্কে দেবে। কী বলিষ্ট উচ্চারণ, ধর্ম না থাকলে ন' নম্বর জুতো পরা মানুষ দশ নম্বর জুতো পরা মানুষের সাথে লড়াই করত। আবার আমরা গভীর ভাবে দেখলে প্রত্যেকেই ভাইবোন... "নক্ষত্রের গুঁড়োয় তৈরি আমাদের শরীর" — গভীরে গিয়ে ভাববার মতো এমন অনেক জায়গাই আছে।
কোন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে লেখা নয়। বা কোন বিশেষ মতাদর্শের প্রচারও নয়। এটা আরও একটি ভালোলাগার কারণ।
উপন্যাসের শেষটি সামান্য আন্দাজ করতে পারলেও সত্যিই যে এতোখানি বলিষ্ঠ হবে তা ভাবিনি৷ বরং ভাললাগা অনেক বেশি জন্মেছে৷
এই বইটির দুটো ভাগ আছে। এতোক্ষণ যা বললাম তা প্রথম ভাগের কথা। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে একটি উপন্যাসিকা। যার প্রতিটা পর্বের আলাদা নাম এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনাবহুল। এই অংশটি বেশ রসালো। আর শব্দের ও চিন্তার বুনন পোস্ট মর্ডানিজমের কথাই বলে। পোস্ট মর্ডানিজম মানে যে কেবল মাত্র শব্দের বাহার এমন নয়। জীবনের প্রতিটি চিন্তার উমুক্ত ভাবনা । এই দুই ছাড়া পোস্টমর্ডানিজম অসম্পূর্ণ৷ আর এই সব কিছুরই গোছানো সুস্পষ্ট প্রকাশ পেলাম পাগলপুর উপন্যাসিকায়৷ সত্যিই লেখক জোর করে না থামালে চলেই যেত৷
সব শেষে বলি অসাধারণ একটি বই। বর্তমান সাহিত্য দুনিয়ায় এরকম খোসাছাড়ানো উপন্যাস কটা আছে জানি না। এই বইটি কখনই বইয়ের আলমারির ধুলো খাওয়ার জন্য নয় বরং শোভাবর্ধক, সাথে সাহিত্যিকদের সাহসেরও জোগাড়দার। যারা ভাবছে বাস্তবিক কথাগুলো বা অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করার সময় খোলসের প্রয়োজন এবং খোলসের অভাবে তারা করতে পারছে না তাদের অনেকটা এগিয়ে দিতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।

পোস্টের ধরণ | বই রিভিউ |
---|---|
ছবিওয়ালা | নীলম সামন্ত |
মাধ্যম | স্যামসাং এফ৫৪ |
লোকেশন | পুণে,মহারাষ্ট্র |
ব্যবহৃত অ্যাপ | ক্যানভা, অনুলিপি |
১০% বেনেফিশিয়ারি লাজুকখ্যাঁককে
~লেখক পরিচিতি~
আমি নীলম সামন্ত। বেশ কিছু বছর কবিতা যাপনের পর মুক্তগদ্য, মুক্তপদ্য, পত্রসাহিত্য ইত্যাদিতে মনোনিবেশ করেছি৷ বর্তমানে 'কবিতার আলো' নামক ট্যাবলয়েডের ব্লগজিন ও প্রিন্টেড উভয় জায়গাতেই সহসম্পাদনার কাজে নিজের শাখা-প্রশাখা মেলে ধরেছি। কিছু গবেষণাধর্মী প্রবন্ধেরও কাজ করছি। পশ্চিমবঙ্গের নানান লিটিল ম্যাগাজিনে লিখে কবিতা জীবন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি৷ ভারতবর্ষের পুনে-তে থাকি৷ যেখানে বাংলার কোন ছোঁয়াই নেই৷ তাও মনে প্রাণে বাংলাকে ধরে আনন্দেই বাঁচি৷ আমার প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থ হল মোমবাতির কার্ণিশ ও ইক্যুয়াল টু অ্যাপল আর প্রকাশিত গদ্য সিরিজ জোনাক সভ্যতা।
কমিউনিটি : আমার বাংলা ব্লগ
আমার বাংলা ব্লগ পরিবারের সব্বাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন৷ ভালো থাকুন বন্ধুরা। সৃষ্টিতে থাকুন।
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.
https://x.com/neelamsama92551/status/1905282496927023203?t=ZX44ZGklvkQs5F8TD9DeOw&s=19
https://x.com/neelamsama92551/status/1905283248588009656?t=yGmqCIb3fASG4Ipp2czj7Q&s=19
https://x.com/pussmemecoin/status/1905168238209622469?t=3kXYxjV3MjaHhol0v2sUjQ&s=19
https://x.com/neelamsama92551/status/1905285298851856786?t=6kzlaCrwp9VqKI-pzKfOKQ&s=19
https://x.com/neelamsama92551/status/1905286054518702414?t=yJBdIl9I3p7Knz7eR2JZHA&s=19
https://x.com/neelamsama92551/status/1905320490010640637?t=OD0-WYVR9rnCMKvSS35R3A&s=19